ওরাও ছিল পাশে

ওরাও ছিল পাশে
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম নাড়া দিয়েছিল বিশ্ববিবেককে। বাঙালির অধিকার আদায়ের সেই সংগ্রাম চিরতরে শেষ করে দিতে যখন পাকিস্তানি সামরিক জান্তা এ দেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর পশুর উন্মত্ততা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল, তখন নিন্দায় মুখরিত হলো বিশ্ব বিবেক। সেদিন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এ দেশের মুক্তিসংগ্রামের সমর্থনে ঘটেছিল কয়েকটি অসাধারণ ঘটনা। আজ স্বাধীনতার ৪০ বছর পূর্তির কালে আমাদের সেই বিদেশি বন্ধুদের অসামান্য প্রচেষ্টার কয়েকটি তুলে আনা হলো ইতিহাসের পাতা থেকে।


দুঃসাহসী জাঁ কুয়ে
কে এই জাঁ কুয়ে? ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বরের আগ পর্যন্ত তাঁকে কেউ চিনত না। কিন্তু ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১, প্যারিসের অর্লি বিমানবন্দরে এই ফরাসি যুবক এক দুঃসাহসী ঘটনা ঘটিয়ে শিরোনাম হন ইউরোপ তথা গোটা পৃথিবীর বড় বড় সংবাদমাধ্যমে। এই যুবক বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেও সমর্থনে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের (পিআইএ) একটি বিমানকে পাঁচ ঘণ্টা রানওয়েতে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন। তাঁর দাবি ছিল, সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারের মুক্তিসংগ্রামে উন্মাতাল একটি জাতির কল্যাণে কিছু ওষুধ, খাদ্যসামগ্রী যেন ওই বিমানটিতে তোলা হয়!
১৯৭১ সালে বাংলাদেশে সংঘটিত মানবেতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যা ছুঁয়ে গিয়েছিল জাঁ কুয়েকে। তিনি সবচেয়ে বেশি কাতর ছিলেন প্রাণ বাঁচাতে ত ৎ কালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে এক কোটি শরণার্থীর ভারতের পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নেওয়ার ঘটনাটিতে। একটি দেশের সেনাবাহিনী কতটা নৃশংস হলে, তাদের ভয়ে প্রাণের ভয়ে অন্য দেশে পালিয়ে যায় দেশের মানুষ—এই হিসাবটিই তিনি মেলাতে পারতেন না।
জাঁ কুয়ে যেদিন বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটান, সেদিন ত ৎ কালীন পশ্চিম জার্মানির ভাইস চ্যান্সেলর উইলি ব্র্যান্ডট ফ্রান্স সফরে আসেন। উদ্দেশ্য বিবিধ বিষয় নিয়ে ফরাসি প্রেসিডেন্ট পম্পেডুর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনা শিকেয় তুলল সবকিছু। আলোচনায় বসা হলো জাঁ কুয়ের সঙ্গে। তিনি সাফ জানিয়ে দিলেন, ব্যক্তিগত কোনো লাভালাভের ব্যাপার এখানে নেই। তিনি কেবল চান মুক্তিযুদ্ধরত বাংলাদেশে যেন ফ্রান্স সরকার ওষুধ ও খাবার সরবরাহ করে সহায়তা দান করে। আর পিআইএর এই বিমানে করেই যেন সেই মালামাল বাংলাদেশে প্রেরণ করা হয়। পিআইএর বিমানের ব্যাপারটি ছিল পাকিস্তানি নৃশংসতার বিরুদ্ধে এক প্রতীকী প্রতিবাদ।
রাষ্ট্র কখনো সহজ-স্বাভাবিক দাবি মেনে নেয় না। জাঁ কুয়ের দাবিও রাষ্ট্র সহজে মেনে নেয়নি। বরং অনেক জল ঘোলা করে কমান্ডো দিয়ে অর্লি বিমানবন্দর ছেয়ে ফেলে ফ্রান্স সরকার, তবে এক পর্যায়ে মেনে নেয় কুয়ের দাবি। বিমানে তোলা হয় ২০ টন খাদ্যসামগ্রী ও ওষুধ। গ্রেপ্তারও করা হয় জাঁ কুয়েকে। অঁদ্রে দ্য মল্তে নামের একটি সাহায্য সংস্থার মাধ্যমে সেই খাদ্রসামগ্রী ও ওষুধ যখন বাংলাদেশে পৌঁছায়, তখন স্বাধীনতা যুদ্ধের মোড় ঘুরে গেছে চূড়ান্ত বাঁকে। পাকিস্তান ভারত আক্রমণ করে বসেছে। ফলে ভারতও জড়িয়ে পড়ে সর্বাত্মক যুদ্ধে। এর মাত্র ১৩ দিন পরেই বিশ্ব মানচিত্রে জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অসামান্য সমর্থন জোগানো এই পরম সুহূদ জাঁ কুয়ে নামের এক ‘পাগল’ যুবকের কথা এখন অবধি অজানাই থেকে গেছে। তবে অতি সম্প্রতি আমার ব্লগসহ কয়েকটি ব্লগে ওঠে এসেছে এই সাহসী যুবকের বীরত্বের কথা।

বাল্টিমোরের প্রতিরোধ
পাকিস্তানি ফ্রেইটার জাহাজ পদ্মা বাল্টিমোর বন্দরে নোঙর করে আছে। এই ফ্রেইটারটি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর জন্য বিপুলসংখ্যক অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই বাল্টিমোর বন্দর ত্যাগ করবে করাচির উদ্দেশে।
তারিখটা ১৯৭১ সালের ১৫ জুলাই। কিন্তু একি! বিপুলসংখ্যক অস্ত্র ও গোলা পদ্মায় তুলে দিতে অস্বীকৃতি জানালেন বাল্টিমোর বন্দরের শত শত শ্রমিক। নেতৃত্বে রয়েছে বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়ন।
তাঁদের কথা একটিই। যে অস্ত্র তাঁদের জাহাজে তুলে দেওয়ার কথা, সেই অস্ত্র দিয়েই তো পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানের অসহায় ও নিরস্ত্র মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। এই অস্ত্রের গুলিই তো কেড়ে নেবে নারী-শিশুসহ অসংখ্য মানুষের অমূল্য প্রাণ। বাল্টিমোরের শ্রমিকেরা এতটা বিবেকহীন নন যে তাঁরা মানুষ হয়ে মানুষ হত্যার রসদ সরবরাহের অনুষঙ্গে পরিণত হবেন।
অচলাবস্থা দেখা দিল বাল্টিমোর বন্দরে। বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও শ্রমিকেরা পদ্মায় অস্ত্র তুলে দিলেন না। করাচি থেকে পাকিস্তান শিপিং করপোরেশনের জরুরি টেলিগ্রাম এল বাল্টিমোর পোর্ট অথরিটির কাছে। শ্রমিকদের এই ধৃষ্টতা ‘পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ’ হিসেবেই মনে করতে থাকল পাক শিপিং করপোরেশন। ইয়াহিয়ার শিখিয়ে দেওয়া বুলি তখন আওড়াচ্ছে শিপিং করপোরেশনের কর্তা-ব্যক্তিরাও।
মার্কিন প্রশাসন পাকিস্তানের বন্ধু। কিন্তু তারা তো আর নিজ দেশের মানুষের শত্রু নয়! বাল্টিমোরের শ্রমিকদের পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি পরোক্ষ সমর্থনকে কিন্তু তারা ‘সরকারি কাজে বাধাদান’ হিসেবে না দেখে শ্রমিকদের কর্ম ও চিন্তার স্বাধীনতা হিসেবেই দেখল। তবে বন্ধুকেও তো খুশি করতে হবে। লোক দেখানোর মতো করেই অস্ত্র বোঝাই করে দিতে অস্বীকৃতি জানানো শ্রমিকদের কয়েকজনকে হাজতে নিয়ে পোরা হলো। এক রাত জেল খেটে তাঁরা পরের দিন সকালেই মুক্তি পেয়েছিলেন।
বাল্টিমোর বন্দরের শ্রমিকদের এই অসাধারণ প্রতিরোধ স্থান পেয়েছে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্রের চতুর্দশ খণ্ডে।





 অপরাধী এক বেলজিয়ান
পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রাণের ভয়ে ভারতে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের সম্পর্কে টেলিভিশনে এক সন্ধ্যায় একটি অনুষ্ঠান প্রচারিত হচ্ছিল। আয়েশি ভঙ্গিমায় তা দেখছিলেন বেলজিয়ান যুবক মারিও রয়মান্স। হঠা ৎ হতদরিদ্র এক মায়ের কোলে অপুষ্টিতে আক্রান্ত, হাড্ডিসার এক শিশুকে দেখে আঁতকে উঠলেন তিনি। মানুষের এমন করুণ চেহারা দেখতে প্রস্তুত ছিল না তাঁর চোখ দুটি। অবাক বিস্ময়ে টেলিভিশনে দেখলেন, কেবল নিজেদের অধিকার বুঝে পাওয়ার দাবি জানাতেই শাসকগোষ্ঠীর কী নির্মম নিষ্পেষণের শিকার হতে হয়েছে এতগুলো মানুষকে। জানলেন, কী জান্তব উন্মত্ততায় ও হিংসায় একটি দেশের সেনাবাহিনী, নিজ দেশেরই মানুষকে ধেয়ে বেড়াচ্ছে হত্যা করার জন্য।
টেলিভিশনে পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে দেখা অনুষ্ঠানটিই যেন কাল হলো রয়মান্সের। মাথা থেকে কিছুতেই ঝেড়ে ফেলতে পারছিলেন না ব্যাপারগুলো। মাথায় ঢুকছিল না, মানুষ কীভাবে এত অসহায় অবস্থায় পড়তে পারে!
পূর্ব পাকিস্তানের শরণার্থীদের জন্য কিছু করার আকাঙ্ক্ষা তাঁকে পেয়ে বসল। কী করবেন কী করবেন ভাবতে ভাবতে ঠিক করে ফেললেন, ব্রাসেলসের গ্যালারি অব ফাইন আর্টস থেকে তিনি একটি চিত্রকর্ম চুরি করে তা বিক্রি করে সেই টাকা দান করবেন পূর্ব পাকিস্তানের সেই অসহায় শরণার্থীদের কল্যাণে।
যেমন ভাবা তেমনি কাজ । রয়মান্স ১৯৭১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর যা করলেন, তা বেলজিয়ামের ইতিহাসের অন্যতম চাঞ্চল্যকর অপরাধের তালিকার ওপরের দিকেই রয়েছে। তিনি চুরি করলেন সপ্তদশ শতকের শিল্পী ইয়োহান ভারমিয়ারের আঁকা ‘দ্য লাভ লেটার’ নামের একটি অসাধারণ তেলচিত্র। ওই সময়ের বাজারমূল্যে যার দাম ধরা ছিল ৫০ লাখ বেলজিয়ান ফ্রাঙ্ক।
সেদিন সন্ধ্যায়ই ব্রাসেলসের গ্যালারি অব ফাইন আর্টসে উদ্বোধন করা হয়েছিল হল্যান্ড, ফ্রান্স, ডেনমার্ক, ইংল্যান্ড, জার্মানির ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকের শিল্পীদের আঁকা বিভিন্ন তেলচিত্রের প্রদর্শনী। অনুষ্ঠানে দর্শকবেশেই তিনি ঢুকেছিলেন। অনুষ্ঠানে ছিলেন শেষ অবধি। রাতের বেলা বন্ধ হয়ে যাওয়া গ্যালারিতে ঢুকে তিনি আলু কাটার ছুরি দিয়ে কেটে ফ্রেম থেকে বের করে আনেন সেই ছবিটি। এরপর গোপন পথ দিয়ে বেরিয়ে সোজা ট্যাক্সি চেপে নিজের বাড়ি। ছবিটি চুরি করে বিপদেই পড়েছিলেন রয়মান্স। কোথায় লুকিয়ে রাখবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না তিনি। শেষে একদিন কোনো এক পত্রিকা অফিসে ফোন করে জানিয়ে দেন নিজের ‘কীর্তি’র কথা। ইয়োহান ভারমিয়ারের সেই তেলচিত্রটি খুঁজে পেতে তখন লাখ লাখ ফ্রাঙ্ক পুরস্কার ঘোষণা হয়ে গেছে। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, এই চুরি তিনি নিজের জন্য করেননি। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, এর মাধ্যমে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের অসহায় শরণার্থীদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করবেন। এ জন্য দেনদরবার করতে থাকেন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে। কিন্তু যেখান থেকে ফোন করে তিনি দরবার করছিলেন, সেখানকারই একজন গোপনে রয়মান্সের কথা শুনে পুলিশে জানিয়ে দেয়। পুলিশ ধাওয়া করে গ্রেপ্তার করে তাঁকে। উদ্ধার করে ভারমিয়ারের ছবিটি। বিচারে দুই বছরের সাজাও দেওয়া হয় রয়মান্সকে।
কিন্তু, গোটা বেলজিয়ামে তখন উল্টো প্রতিক্রিয়া। সত্যিই তো, রয়মান্স তো কোনো অন্যায় করেননি। তাঁর গ্রেপ্তার ও সাজা দেওয়ার প্রতিবাদে তরুণেরা রাস্তায় নেমে আসে। জনতার দাবির মুখে নতি স্বীকার করে বেলজিয়ান সরকার তাঁর সাজার মেয়াদ কমিয়ে ছয় মাস করে।
কারাভোগ অবশ্য ক্ষতির কারণ হয় রয়মান্সের জন্য। শরীর ভেঙে যায় তাঁর। তত দিনে অবশ্য বাংলাদেশও স্বাধীনতা পেয়ে যায়। কিন্তু কারাগারে বাস করে মানসিক আঘাত পাওয়া রয়মান্স আর নিজেকে ফিরে পাননি। ১৯৭৮ সালে খুব অল্প বয়সে তিনি পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নেন।
মারিও রয়মান্সের এই অসাধারণ আত্মত্যাগ তো আমাদের স্বাধীনতার জন্যই। তাঁর কৃতিত্বের কথা জানতে আমাদের ৪০ বছর লেগে গেল।


ক্রিকেট মাঠের প্রতিবাদ
ব্রিটেন তখনো বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি। কিন্তু কর্ম ও চিন্তার স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ব্রিটিশরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে তখন নীরব অথচ প্রশ্রয়দীপ্ত সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ত ৎ কালীন উপাচার্য ও বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী তখন লন্ডনে। এ দেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে বিশ্বজনমত গড়ে তুলতে তিনি তখন অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন। এরই মধ্যে খবর এল, পাকিস্তান ক্রিকেট দল টেস্ট সিরিজে অংশ নিতে ইংল্যান্ড সফরে আসছে। বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ও প্রবাসী নেতৃত্ব সিদ্ধান্ত নিল, যে দেশের সেনাবাহিনী নির্বিচারে নিজ দেশের মানুষের ওপরই নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে, সে দেশের কোনো ক্রীড়াদলের বিদেশের মাটিতে নির্বিবাদে খেলাধুলায় অংশ নিতে দেওয়া যেকোনো বিবেকবান মানুষের পক্ষেই অনুচিত। তারা প্রতিটি ভেন্যুতেই পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের কালো পতাকা প্রদর্শনের কর্মসূচি ঘোষণা করলেন।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী লন্ডনের বিখ্যাত লর্ডস, ম্যানচেস্টারের ওল্ড ট্র্যাফোর্ড ক্রিকেট গ্রাউন্ড, লন্ডনেরই আরেক বিখ্যাত ক্রিকেট ভেন্যু দ্য ওভাল, বার্মিংহামের ট্রেন্টব্রিজ প্রভৃতি সব জায়গাতেই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করলেন ব্রিটেন প্রবাসী বাঙালিরা। বিব্রত হলেন পাকিস্তানি ক্রিকেটাররা। ব্রিটিশরা জানল, পাকিস্তানে স্বাভাবিক পরিস্থিতি নেই। কোনো হাঙ্গামা নয়, চি ৎ কার করে প্রতিবাদ নয়, হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে টেস্ট ম্যাচগুলোর সময় কেবল বাঙালিরা জানিয়ে দিল, ওরা (পাকিস্তানিরা) আমাদের এমন একটি পরিস্থিতির মধ্যে ঠেলে দিয়েছে, যেখানে দাঁড়িয়ে আমরা বাঙালিরা এখন আর পাকিস্তানকে নিজের দেশ হিসেবে কিছুতেই ভাবতে পারি না।


 সায়মন ড্রিং
২৫ মার্চ গণহত্যা শুরু করার আগে পাক আর্মি বিদেশি সাংবাদিককে আটকে ফেলেছিল হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের ভেতরে। এরপর সব সাংবাদিককে হোটেল থেকে সরাসরি বিমানে তুলে ঢাকা ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিলো, যাতে বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যম গণহত্যার কোনো সংবাদ সংগ্রহ করতে না পারে। পাকিস্তানি সামরিক আইন অমান্য করে জীবনের ঝুকি সায়মন ড্রিং লুকিয়ে পড়েছিলেন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে। এরপর ড্রিংয়ের জীবনের শ্বাসরুদ্ধকর ৩২ ঘণ্টা সময় কেটেছিল হোটেলের লবি, ছাদ, বার, রান্নাঘরে। তারপর ইতিহাস, তিনি ঘুরে ঘুরে নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করেছিলেন গণহত্যার বিভীষিকাময় সেইসব হত্যাযজ্ঞের বাস্তব-চিত্র। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রথম খবর প্রকাশ করেন সায়মন ড্রিং। সেইসব ঘটনা নিয়ে একটা চমৎকার ডকুমেন্টারি আছে, সম্ভব হলে দেখে নেবেন।
ডেইলী টেলিগ্রাফের তরুন রিপোর্টার সায়মন ড্রিং কিংবা লাইফ ম্যাগাজিনের জন সার, বিটলসের জর্জ হ্যারিসন কিংবা ফরাসী যুবক জ্যঁ ক্যুয়ে এদের সবার একটা মিল আছে, সেটা হচ্ছে এই মানুষ গুলো বাঙালী ছিলেন না তবুও কেবলমাত্র বিবেকের টানে জীবনের ঝুকি নিয়ে তারা এমন সব কান্ড কারখানা করেছিলেন।


যেই মানুষগুলোর জন্য জীবনের স্বর্ণালি সময় গুলো জেল খেটেছেন সেই জাতির মানুষেরা আসলে এই দেশটাকে চায় নাই, তারা তাদের ওপর নিপীড়নকারীদের জন্য দিন রাত হেগে-মুতে আস্ফালন করে। স্বাধীনতা বিরোধী গনহত্যার মাস্টারমাইন্ডের জানাজায় লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম হয়। তাদের নিজেদের বাপ-দাদার খুনিদের পক্ষে কথা বলে সেই দেশের কোটি কোটি মানুষ। তাহলে হয়তো দুবার ভাবতেন এতটা করার আগে...


Source Link: http://archive.prothom-alo.com/detail/date/2011-12-02/news/205532
https://www.amarblog.com/index.php?q=omipial/posts/140328
https://www.facebook.com/Arif1415/posts/1065907490098664
বিস্তারিত পড়ুন

ভাষা আন্দোলনের নির্মোহ ইতিহাস এবং আমাদের ভাষা সৈনিকরা

ভাষা আন্দোলনের নির্মোহ ইতিহাস এবং আমাদের ভাষা সৈনিকরা
[ প্রাক-ধারণাঃ এই লেখাতে আমরা জানতে পারবো রবীন্দ্রনাথের বাঙলা ভাষা বিরোধিতা, ডঃ মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ এবং রবীন্দ্রনাথের যুক্তিতর্ক, ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট সৃষ্টিতে বিভিন্ন ম্যাগাজিন ও পুস্তিকার ভূমিকা, পূর্ব পাকিস্তানের জনক জিন্নাহর ঐতিহাসিক ভুল, ভাষা সৈনিক মতিনের অভূতপূর্ব প্রতীবাদের কথা, ভাষা আন্দোলনে শেখ মুজিবর রহমান এবং গোলাম আজমের ভূমিকা, ভাষা দিবসের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে এক নীরব কর্মীর কর্মযজ্ঞ; বিতর্কিত আলোচনার মাঝে থাকবে- ভাষা শহীদরা আসলেই কি ভাষা শহীদ, তাঁরা সবাই কি আন্দোলনের কর্মী ছিল, ছাত্রদের ভাষা আন্দোলনের কারন কি, শুধুই কি ভাষাপ্রেম- নাকি অন্য বিষয়ও ছিল, ভাষা দিবস কেন আটই ফাগুণ না হয়ে একুশ ফেব্রুয়ারি পালন করা হয় ইত্যাদি নানা প্রশ্নের ছোট ছোট উত্তর।]

মানুষ নিজেকে প্রাণী জগৎ থেকে আলাদা করেছে ভাষা দিয়ে। কোনো সুগঠিত ভাষা না থাকলে বন্য প্রাণী থেকে মানুষকে আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়তো। পৃথিবীর ইতিহাসে মাতৃভাষার দাবীতে কয়েকটি জাতিগোষ্ঠীর ছোটখাটো আন্দোলনের কথাকাব্য শুনা যায়; কিন্তু বাঙালির মতো সুগঠিত আন্দোলন এবং ভাষার জন্য জীবন দেওয়ার মহাকাব্যের ইতিহাস কোনো জাতির নেই। এই স্বর্ণময় ইতিহাসের সাক্ষী একমাত্র বাঙালি জাতি। জাতীয় জীবন যখন বিপর্যস্ত, সংস্কৃতি যেখানে বিলুপ্তের পথে, মুজিব যেখানে বিতর্কিত, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাও যেখানে বিকৃত, সব মিলিয়ে নানা দো-টানার মাঝে একমাত্র প্রেরণার উৎস ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস।
বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনের শুরুটা ভাষা আন্দোলন থেকেই। বায়ান্নের তীব্র আন্দোলন হতে বাঙালি নিজেকে পাকিস্তান থেকে পৃথক ভাবতে শুরু করে। তবে বাঙলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা করার পক্ষে প্রথম মত প্রকাশ করে এক ব্রিটিশ নাগরিক ন্যাথেলিয়ান ব্রাথি হেডলেট। ১৭৭৮ সালে “অ্যা গ্রামার অব দ্যা বেঙ্গল ল্যাংগুয়েজ” নামে বাঙলা বইতে তিনি প্রথম দাবী করেন ফার্সির পরবর্তীতে বাঙলা ভাষাকে সরকারি কাজে ব্যবহার করার জন্য। ১৯১৮ সালে ভবিষ্যৎ স্বাধীন ভারত উপমহাদেশে দেশের ভাষা কি হবে তা নিয়ে বুদ্ধিজীবী মহলে আলোচনা সভা হয়। রবীন্দ্রনাথ হিন্দি ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে মত প্রকাশ করেন। সভার মাঝেই মহাকবির প্রস্তাবের সরাসরি বিরোধিতা করেন ভাষা গবেষক ডঃ মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ।
ডঃ শহিদুল্লাহ যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করতে চেষ্টা করেন হিন্দি-উর্দু থেকে বাঙলা ভাষার স্থান অনেক উঁচুতে। বাঙলা ভাষায় অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষা থেকে সুগঠিত। হিন্দু-উর্দু থেকে বাঙলায় শব্দ সংখ্যা বেশি, তাই মনের ভাব সুন্দরভাবে প্রকাশ করা যায়। সভায় ডঃ শহিদুল্লাহ’র বক্তব্যে হইচই পড়ে যায়। ১৯২১ সালে ব্রিটিশদের কাছে লিখিত প্রস্তাব করা হয়, “ভারতের রাষ্ট্র ভাষা যাই হোক, তবে বাঙালিদের ভাষা হবে বাঙলা।“ পরবর্তী কোনো এক সময়ে মহাত্মা গান্ধী ঘোষণা দিলেন, “ভারতের রাষ্ট্রভাষা হবে হিন্দি।“ হিন্দিকে সমগ্র ভারতের ভাষার দাবী ওঠার পর থেকে ভারতের মুসলমানরা ক্ষেপে যায়। তাদের পক্ষ থেকে দাবী ওঠে উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা করার। উপমহাদেশে তখন ধর্ম নিয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছিল। হিন্দি হিন্দুদের ভাষা- অন্যদিকে উর্দু-আরবি মুসলমানদের ভাষা এই ধরনের মতবাদ ছিল। যদিও পশ্চিম পাকিস্তানিরা মনে করতো বাঙলাও হিন্দুদের ভাষা। তাই ধর্মীয় মতবাদের উপর দেশভাগের পর পাকিস্তানীরা চাপ সৃষ্টিকরে বাঙলা ভাষার উপর। যার ফলেই জন্ম হয় ভাষা আন্দোলনের।
১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হল। পাকিস্তানিরা প্রথম দিন থেকেই বাঙালিদের নানা কিছুতে বঞ্চিত করে আসছিল। কাগজ তৈরি হতো বাঙলায়, চার পয়সা খরচে। সেই কাগজ পশ্চিম পাকিস্তানে বিক্রি হতো আট পয়সায়, আর বাঙলায় বিক্রি হতো বারো পয়সায়। এইভাবে নানা বিষয় থেকে বাঙালির মনে জন্ম নিতে থাকে ক্রোধ, দ্রোহ, ঘৃণা। মনের ক্ষোভ প্রকাশের প্রধান হাতিয়ার ভাষা, পাকিস্তানিরা প্রথম দিন থেকে সেই ভাষা ছিনিয়ে নিতে চাইলো। তাই বাঙালি সুসংবদ্ধ হতে থাকে এবং তারই প্রেক্ষাপটে এক সময় জন্ম হয় ভাষা আন্দোলনের।
ভাষা আন্দোলনের সাংগঠনিক শুরুটা পাকিস্তান জন্মের ১৬ দিন পরে। বাঙলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য গঠন করা হয় প্রথম ভাষা আন্দোলনের সংগঠন তমদ্দুন মজলিস। ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ভাষার দাবী আদায়ের লক্ষে “পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাঙলা না উর্দু“ শিরোনামে প্রথম পুস্তিকা প্রকাশ করা হয়। বাঙলার কিছু মানুষ চাইতো এদেশের রাষ্ট্রভাষা হোক উর্দু। এতে উর্দু যারা ভালো জানে তারা লাভবান হবে, চাকরিতে সুবিধা পাবে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভাষার দাবী পক্ষে আদায়ের কথা বলার দুটি কারন ছিল। প্রথমটি ভাষা প্রেম। দ্বিতীয়টি উর্দু না জানলে তাদের উচ্চ পড়াশুনা সব বিফলে। তাই ভাষার জন্য আন্দোলন করা ছাড়া বিকল্প কোনো পথ ছিল না। দুটানা অবস্থার মাঝে ১৯৪৭ সালের ১২ ডিসেম্বর এই বাঙলার বুকে বাঙলা এবং উর্দু সমর্থকদের মাঝে সংঘর্ষ হয়, আহত হয় বিশ জন।
১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ গ্রেফতার হলেন শেখ মুজিব রহমানসহ আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা। সেদিন মিছিলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী একে ফজলুল হকও অংশগ্রহণ করে। আহত হয় পঞ্চাশ জনের মতো। ১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ জিন্নাহ প্রথম বাঙলায় আসে। জিন্নাহ পাকিস্তানের জনক। বাংলাদেশ তখন পাকিস্তানের অধীনে। তাই জিন্নাহ তৎকালীন বাঙলারও পিতা। দেশ জনকের প্রতি প্রথম দিকে বাঙালির ভালোবাসা ছিল বলে ধারনা করতে পারি। কিন্তু ২১ মার্চ তিনি রেসকোর্সের ভাষণে বললেন উর্দুই একমাত্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। বলা যায় তখন থেকেই জিন্নাহ তার ভালোবাসায় আগুণ জ্বালিয়ে দিলো। ভাষা ছিনিয়ে নেওয়ার এই বর্বর সিদ্ধান্ত বাঙালির চোখে জিন্নাহ হয়ে উঠল আদর্শ নেতা থেকে চরম শত্রু।
রেসকোর্সে ভাষণের দু’দিন পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে জিন্নাহ একই ভুল আবার করেন। জিন্নাহ ঘোষণা দিলো “অখণ্ড পাকিস্তানের ভাষা হবে উর্দু।“ সমাবর্তন সভার মাঝেই বিরোধিতা করে উঠল ভাষা মতিন। তিনি চিৎকার দিয়ে বলনে, “না, না। তা হবে না।“ সমাবর্তন অনুষ্ঠান মঞ্চ হয়ে গেলো রাষ্ট্রপ্রধানের সামনে ভাষা আন্দোলনের দাবীর ক্ষেত্র। ১৯৪৮ সালে ১৪ নভেম্বর প্রকাশ করা হয় ভাষা আন্দোলনের প্রথম মুখপত্র সাপ্তাহিক সৈনিক। আন্দোলনের মাঝে দিন-রাত চলতে থাকে। এমন সময় ১৯৪৮ সালের ২৭ ডিসেম্বর পশ্চিম পাকিস্তান থেকে প্রস্তাব করা হয় আরবি হরফে বাঙলা লেখার জন্য। যা ছিল বাঙলা ভাষার জন্য চূড়ান্ত অপমান এবং একটি ভাষা ধ্বংসের বিচক্ষণ পক্রিয়া। দিন চলতে থাকে জুলুমের মধ্য দিয়ে।
১৯৪৯ সালের ৯ জানুয়ারি “মুসলিম ছাত্রলীগ” দিনটিকে প্রথম “জুলুম দিবস” পালন করে। ১৯৪৮ সালের পর থেকে, প্রতিটি ১১ মার্চ ভাষা দিবস হিসাবে পালন করা হয়। ১৯৫১ সালের ১১ মার্চ ভাষা দিবস পালনের সময় প্রথম রাষ্ট্রভাষা বাঙলা চাই শ্লোগানে প্ল্যাকার্ড এবং পতাকা তৈরি করা হয়। ভাষার দাবী আদায়ের জন্য ১৯৪৭ থেকে ১৯৫২ হরতাল, ধর্মঘট, মিছিল, সমাবেশ, ১৪৪ ধারা সব লেগেই ছিল। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতেও ১৪৪ ধারা ছিল। তাই আন্দোলনের নেতাদের মধ্যে বিভেদ দেখা দেয়। ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে বিপক্ষে যুক্তি আসতে থাকে। আলোচনার শেষ রাতে ভোটে সিদ্ধান্ত হয় ১৪৪ ধারা ভাঙা হবে না। আন্দোলনে প্রথম সাড়ি নেতাদের পনের ভোটের মাঝে এগারো ভোট ছিল ২১ ফেব্রুয়ারি কোন মিছিল-সমাবেশ করার বিপক্ষে। তবুও ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২, ৮ ফাল্গুন, বৃহস্পতিবার, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ক্যাম্পাসে একত্র হতে থাকে। বেলা এগারোটায় সভা হয়।
সভার মাঝেই বক্তাদের বক্তব্যে ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি চলতে থাকে। সব শেষে ভাষা মতিনের জোরালো বক্তব্যে আগুণ ছড়িয়ে পড়ে। শ্লোগান উঠতে থাকতে ১৪৪ ধারা ভাঙার। তীব্র শ্লোগানে নেতারা সিদ্ধান্ত নিলেন ১৪৪ ধারা ভাঙার। চারপাশে পুলিশ, তাই ছোট দল করে ক্যম্পাস থেকে বের হবার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু এর মাঝেই পুলিশ কাঁদানো গ্যাস ছুড়তে থাকে। বিকাল তিনটায় আইন পরিষদের সভা ছিল। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা আইন পরিষদের দিকে যেতে থাকে। পুলিশ ছাত্রদের উপর লাঠি চার্জ চালায়। ছাত্ররা ইট পাটকেল ছুঁড়তে থাকে। একসময় পুলিশ বেপরোয়া হয়ে উঠে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার মাঝে পুলিশ গুলি চালায়। শহীদ হয় কয়েকজন, আহত হয় ১৭জন।
২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনার পর দেশের রাজনৈতিক অবস্থা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে থাকে। ২৩ ফেব্রুয়ারি সিদ্ধান্ত হয় শহীদ মিনার বানানোর। মেডিক্যাল নতুন বিল্ডিং তৈরির জন্য পাশেই ইট বালি ছিল তা দিয়ে রাতের মাঝেই নির্মাণ করা প্রথম শহীদ মিনার। ২৪ ফেব্রুয়ারি শহীদ মিনার উদ্বোধন করেন শহীদ শফিউরের পিতা। ২৬ ফেব্রুয়ারি শহীদ মিনার ভেঙে ফেলা হয়। এরপরেও পরের বছর ১৯৫৩ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি ভাঙা শহীদ মিনারের মানুষের ঢল নামে। ১৯৫৪-৫৫ সালে যাতে আন্দোলন করা না যায়, তার জন্য ফেব্রুয়ারির আগেই গ্রেফতার করা হয় সব আন্দোলন কর্মীদের। জমতে থাকা দ্রোহের ভয়ে অবশেষে ১৯৫৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি বাঙলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে বাধ্য হয় পাকিস্তান সরকার।
ভাষা আন্দোলনের অনেক বছর পর ভাষা আন্দোলন দিনটিকে ইংরেজি তারিখে কেন স্মরণ করা হয় তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তবে উত্তরটাও খুব সহজ। পৃথিবীর পাতায় ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসটা রচিত হয়েছে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে। বায়ান্নতে আন্দোলনের সময় নেতারা প্রচারের কাজে প্রতিবাদের দিন ঠিক করেছিল ২১শে ফেব্রুয়ারী; কোথাও ৮ই ফাল্গুন লেখা ছিল না। পরে দেখা যায় ৮ই ফাল্গুনটা বিশ্ববাসীর কাছেও পরিচিত পাবে না। তাছাড়া আন্তঃর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে হলে আন্দোলনে গ্রেগরিয়ান তারিখ লিখতে হবে। তাই আমাদের ভাষা দিবস একুশে ফেব্রুয়ারি। ১৯৯৮ সালে কানাডা প্রবাসী রফিকুল ইসলাম নামের এক ব্যাক্তি জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনানের কাছে চিঠি লিখে যুক্তি দিয়ে অনুরোধ করেন ২১ শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস করার জন্য। জাতিসংঘের মহাসচিব পত্রটি গুরুত্ব দিয়েই নিলেন। ইউনস্কো দেখলো বিশ্বের মাঝে বিলুপ্ত ভাষার সংখ্যা প্রায় তিন হাজার। বিলুপ্ত ভাষা রক্ষা এবং ভাষা সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ১৯৯৯ সালে ইউনস্কোর ঘোষণা আসলো ২১ শে ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবস।
ভাষা আন্দোলনের সময় মুজিবের ভূমিকা নিয়ে প্রায় সময় প্রশ্ন উঠে। ভাষা আন্দোলনের একাধিক লেখায় পেয়েছি তিনি তখন ছিলেন দ্বিতীয় সাড়ির নেতা। অবশ্য বয়সেও তিনি দ্বিতীয় সাড়ির ছিলেন; অনেকের থেকে বয়সে ছোট ছিলেন। তিনি ভাষা আন্দোলনের কারনেই ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ গ্রেফতার হয়েছিলেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে মুজিব জেলে ছিলেন। আবার অনেকে রাজাকার গোলাম আজমকে ভাষা সৈনিক দাবি করে। কিন্তু ভাষা আন্দোলনের শুরুতে একটা মানপত্র পাঠ করা ছাড়া তার আর কোনো ভূমিকা ছিল না। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষ থেকে একটি মানপত্রে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানানো হয়। ইউনিয়নের ভাইস প্রেসিডেন্ট অরবিন্দ বোসের এই মানপত্র পাঠ করার কথা ছিল। কিন্তু একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী বাংলা ভাষার দাবি সংবলিত মানপত্র পাঠ করলে লিয়াকত আলীর মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে। তাই সেদিন হিন্দু অরবিন্দ বোসকে বাদ দিয়ে মুসলমান গোলাম আযমকে দিয়ে সেই মানপত্র পাঠ করানো হয়েছিল।
ভাষা দিবস আমাদের সর্বোচ্চ মর্যাদার আসনে আছে তেমন কোন সন্দেহ নেই। তবে ভাষা দিবস বেশ কিছু পৌরাণিক কাহিনীও আছে। যেমন,- সব ভাষা শহীদ আন্দোলনের মিছিলে গুলিবিদ্ধ হয় নি; এমনকি ভাষা শহীদ বলে যাদের জানি তাঁদের অধিকাংশ আন্দোলনে অংশগ্রহণও করেন নি – তবে এটিও সত্য যে ভাষা আন্দোলন না হলে তাঁরা গুলিবিদ্ধ হতেন না। মূল্যবোধে আঘাত এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা থেকে আমাদের গবেষক সমাজ এই বিষয়টি নিয়ে চুপ থাকায় ভাষা শহীদ মর্যাদার বিষয়টি আমাদের চোখে ডগমেটিক রূপ পেয়েছে।
ভাষা শহীদ আবদুল জব্বার শাশুড়িকে ক্যান্সারের চিকিৎসা করাতে ১৯৫২ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারীতে ঢাকায় আসেন। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ছাত্রদের আবাসস্থল গফরগাঁও নিবাসী হুরমত আলীর রুমে উঠেন। ২১ ফেব্রুয়ারি আন্দোলনরত ছাত্রদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষে কি হয়েছে দেখার জন্য তিনি রুম থেকে বের হয়ে আসেন। তখনই পুলিশ গুলি শুরু করে এবং এলোপাথাড়ি গুলিতে জব্বার মারা যায়।
ভাষা শহীদ রফিকের বাড়ি নিকগঞ্জের সিঙ্গাইরের পারিল গ্রামে। রাহেলা খাতুন পানুর সঙ্গে প্রেম থেকে পারিবারিকভাবে বিয়ের কথা পাকাপাকি হয়। রফিক ঢাকা আসেন বিয়ের শাড়ি-গহনা কিনতে। ২১ তারিখ সন্ধ্যায় তার বাড়ি ফিরবে রফিক। কিন্তু এর আগেই পুলিশের এলোপাথাড়ি গুলিতে মেডিকেল হোস্টেলের বারান্দায় গুলি খেয়ে পড়ে রইল রফিক। ভাষা শহীদ আবুল বরকতের ক্ষেত্রেও একই সত্য। তিনি রাস্তায় নয়, রুমের বারান্দায় গুলি খেয়েছিলেন।
ভাষা শহীদ শফিউর শহীদ হয়েছিলেন ২২ ফেব্রুয়ারি। ২২ তারিখ সকাল দশটার দিকে ঢাকার রঘুনাথ দাস লেনের বাসা থেকে সাইকেলে চড়ে অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা হন শফিউর রহমান। দশটার দিকে ২১শে ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশ পুণরায় গুলিবর্ষণ করে। পুলিশের গুলি শফিউর রহমানের পিঠে এসে লাগে। তবে সালাম একমাত্র ভাষা শহীদ, যিনি আন্দোলনের মাঝেই গুলি খেয়েছিলেন। আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাঁকে ভর্তি করা হয়। দেড় মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর ৭ এপ্রিল এই মহান ভাষা সৈনিক মৃত্যুবরণ করেন।


বিস্তারিত পড়ুন

ধর্মের সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

ধর্মের সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
সমাজতত্ত্বে ধর্মের একটি বিশেষ গুরুত্ব আছে। ধর্ম নিয়ে আলোচনা, পর্যালোচনা, সমালোচনা প্রতিনিয়তই হচ্ছে। বিশ্ব এখনও ধর্মের বিশাল প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। খুব সতর্কতার সাথে আমি ধর্ম নিয়ে সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে এই আলোচনাটা শুরু করছি। আমি আশা করছি এই লেখাটি ধর্ম নিয়ে আমাদের মনে যত সনাতন ধারণা আছে, সেগুলো চূর্ণবিচূর্ণ করে যুক্তিসম্মতভাবে ভাবতে সাহায্য করবে।
ধর্ম কিভাবে ব্যক্তিবর্গের জীবনসমূহ কিনে নিতে সক্ষম? কেনইবা ধর্মের জন্য মানুষ জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত থাকে? মানবসমাজে ধর্ম কিভাবে এত প্রভাব বিস্তার করলো? কোন কোন অবস্থায় ধর্ম আমাদের মাঝে একাত্মতা তৈরি করে আর কোন কোন ক্ষেত্রে বিভেদের সৃষ্টি করে? ধর্ম কি বিলুপ্তির পথে? চলুন, আমরা এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করি।

ধর্ম কী?

ধর্ম হচ্ছে কিছু প্রতীকের সমষ্টি, যেগুলো আমাদের মাঝে শ্রদ্ধা কিংবা শ্রদ্ধামিশ্রিত ভয়ের সৃষ্টি করে। এই ধর্মীয় প্রতীকগুলো সকলের কাছে পবিত্র বলে বিবেচিত হয়। ধর্মের একটা সুন্দর সংজ্ঞায়ন করার চেষ্টা করে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর গেভিন ফ্লাড বলেছেন, “ধর্ম সংস্কৃতির বাইরের কিছু নয়। ধর্ম সংস্কৃতির নিগড়েই গাঁথা। তবে সংস্কৃতির আওতা অনেক বিশাল, তাতে রাজনীতি, সমাজ, সমাজকাঠামো – সবই থাকতে পারে। ধর্ম মূলত সংস্কৃতিরই অংশ। ধর্ম হচ্ছে আত্মজিজ্ঞাসার আইনসিদ্ধ স্থান, যা কখনই সংস্কৃতির বহির্ভূত নয়।”
আমাদের মনে রাখতে হবে, শুধুমাত্র একেশ্বরবাদে বিশ্বাস করাকেই ধর্ম বলে না। (একেশ্বরবাদ মানে হলো এক ঈশ্বর বা দেবদেবীর প্রতি বিশ্বাস)। অধিকাংশ ধর্মেই একাধিক ঈশ্বর বা দেবদেবীর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় খৃষ্টান ধর্মে ঈশ্বর, যীশু, মেরি ইত্যাদি পবিত্র চরিত্রের উপস্থিতি রয়েছে। আবার এমনও ধর্ম রয়েছে যেগুলোতে আদতে কোন ঈশ্বরের উপস্থিতিই নেই।
প্রতিটি ধর্মেই কিছু নির্দিষ্ট নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়। ধর্মের সাথে যুক্ত এসমস্ত আচরণবিধিসমূহ খুবই বৈচিত্র্যময়। যেমন, বিভিন্ন উপায়ে প্রার্থনা করা, নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত খাওয়া দাওয়া থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা ইত্যাদি।

ধর্মের সাথে যাদুবিদ্যার সম্পর্ক আছে কি?

ধর্ম ও যাদুবিদ্যা- এই দুটো বিষয়ে নির্দিষ্ট সীমারেখা অঙ্কন খুব একটা সহজ নয়। কিন্তু দুটোকে আবার এক করেও দেখা যায় না। কিছু মন্ত্রপাঠ করে কিংবা বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করে কোন ঘটনাকে প্রভাবিত করাকে যাদুবিদ্যা বলে। এখানে আমরা স্যামনদের (shaman) কথা বলতে পারি। স্যামন হলো এমন ব্যক্তি যিনি আত্মাসমূহ বা অ-প্রাকৃত শক্তিসমূহকে আচরণবিধিসমূহের মাধ্যমে নির্দেশ দিতে পারেন বলে বিশ্বাস করা হয়।
মানুষ তাঁর দুর্ভাগ্য কিংবা বিপদের সময়েই যাদুবিদ্যার সম্মুখীন হয়। আধুনিক বিশ্বে যাদুবিদ্যার প্রচলন কমে এলেও সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয় নি। এখন ধর্মের দিকে নজর দিলে যাদুবিদ্যার সাথে এর বেশ কিছু সম্পর্ক লক্ষ্য করা যায়। তাবিজ, লকেট, বিভিন্ন মন্ত্রপাঠ করে বিপদ-আপদ দূরীকরণ, মঙ্গল কামনায় দোয়া পাঠ ইত্যাদি ধর্মের অংশ। কিন্তু এই সমস্ত কার্যাবলীর সাথে যাদুবিদ্যার বেশ সামঞ্জস্য লক্ষ্য করা যায়। ধর্মীয় এসমস্ত কর্মকান্ডকে যাদুবিদ্যা বলা না গেলেও এগুলো “প্রায় যাদুবিদ্যা”।

ধর্ম বিষয়ে বিভিন্ন তত্ত্বই অংশে উল্লেখ করার মতো তিনজন বিখ্যাত সমাজবিজ্ঞানীর (কার্ল মার্ক্স, এমিল ডুর্খেইম, ম্যাক্স ভেহ্বার) তত্ত্ব রয়েছে, তবে আমরা শুধুমাত্র মার্ক্সের তত্ত্বটি নিয়েই আলোচনা করছি-

মার্ক্স ও ধর্ম
ধর্ম নিয়ে কার্ল মার্ক্সের একটি বিখ্যাত উক্তি আছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেই উক্তির শুধুমাত্র শেষাংশটুকুকে কেন্দ্র করে মার্ক্সের বক্তব্যের সমালোচনার চেষ্টা করেছেন অনেকেই। ধর্ম সম্পর্কে কার্ল মার্ক্স বলেছেন, “Religion is the sigh of the oppressed creature, the heart of a heartless world, and the soul of soulless conditions. It is the opium of the people.”
এককথায় ধর্ম সম্পর্কে অসাধারণ একটি কথা। কিন্তু ধর্ম সম্পর্কে “…It is the opium of the people” এই কথাটাতে মার্ক্স সমালোচিত হন।
ধর্মের উপর বেশ ভালো দখল থাকা সত্ত্বেও মার্ক্স আলাদা করে ধর্ম নিয়ে বিশদ পড়াশোনা করেননি। তবে ধর্ম সম্পর্কে মতামত ব্যক্ত করতে গিয়ে তিনি ঊনিশ শতকের কয়েকজন দার্শনিক দ্বারা প্রভাবিত হন। এদের একজন হলেন ল্যুদভিগ ফয়েরবাখ (Ludwig Feuerbach)। ধর্ম সম্পর্কে ফয়েরবাখের একটা বিখ্যত রচনা আছে, নাম Essence of Christianity। ফয়েরবাখের মতে, ধর্ম হলো সেই সমস্ত মূল্যবোধ ও ধারণার সমষ্টি, যেগুলো মানুষ তাঁদের সাংস্কৃতিক বিকাশের ধারায় সৃষ্টি করেছে, কিন্তু ভুলভাবে সেগুলির উপর ঐশ্বরিক শক্তি বা দেবদেবীদের আরোপ করা হয়েছে। যেহেতু মানুষ সম্পূর্ণভাবে ইতিহাস বোঝে না, তাই তাঁরা সমাজ সৃষ্ট মুল্যবোধ, নিয়ম-কানুন ঈশ্বরের ক্রিয়াকলাপ বলে মনে করে।
আমরা যতদিন পর্যন্ত না আমাদের সৃষ্ট ধর্মীয় প্রতীকসমূহের প্রকৃতি উপলব্ধি করছি, ততদিন পর্যন্ত আমরা সেসমস্ত শক্তির আড়ালে বন্দী থাকবো, যেগুলো আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। একবার যদি মানুষ এই সত্যটা উপলব্ধি করতে পারে যে, যাবতীয় মূল্যবোধসমূহ যেগুলো ধর্মের নামে চালানো হচ্ছে সেগুলো আসলে তাদেরই সৃষ্টি, তাহলে সেইসমস্ত মূল্যবোধসমূহ পৃথিবীতেই প্রাপ্তিযোগ্য হয়।
মার্ক্সের মতানুযায়ী ধর্ম মানুষের আত্ম-বিচ্ছিন্নতার প্রতিনিধিত্ব করে থাকে। মার্ক্সের আরো বলেছেন, সাবেকী ধরনের ধর্ম বিলুপ্ত হয়ে যাবে, এবং সেটা হয়ে যাওয়াই উচিত। তবে ধর্মের মধ্যে নিহিত মূল্যবোধ, নৈতিকতা, আদর্শ, ইত্যাদি আমরা আমাদের মাঝেই লালন করতে পারি। কারণ মূল্যবোধ, আদর্শ এগুলো নিজেরা ভুল নয়। যেসমস্ত দেবদেবী বা অলৌকিক সত্তাকে আমরা সৃষ্টি করেছি, তাদেরকে আমাদের ভয় করা উচিৎ নয়। মার্ক্সের মতে যেসমস্ত মূল্যবোধ আমরা নিজেরাই চরিতার্থ করতে পারি সেগুলো তাঁদেরকে উৎসর্গ করা থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়।

ধর্মের প্রকারভেদ

প্রায় প্রতিটি সমাজেই, তবে বিশেষত ঐতিহ্যবাহী সমাজসমূহে, ধর্ম একটি মূখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। আমরা এই লেখার একদম শুরুতেই উল্লেখ করেছি ধর্ম হচ্ছে মূলত কিছু প্রতীকের উপর বিশ্বাস, যে বিশ্বাসে ভয় এবং শ্রদ্ধা দুটোর মিশ্রণ থাকে। 
ধর্মের প্রকারভেদ সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলেই টোটেমবাদ (totemism) ও সর্বপ্রাণবাদ (animism) আলোচনার শুরুতেই চলে আসে।
কোন প্রাণী কিংবা গাছের ‘প্রতীকী’ শব্দ হিসেবে ভারতীয় উপজাতিদের মধ্যে এই টোটেম শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। কিন্তু কথাটি কোনো গাছ বা প্রাণীর অতিপ্রাকৃত শক্তি আছে বোঝাতেই ব্যপকভাবে ব্যবহৃত হয়। সাধারণ প্রতিটি সাধারণ সমাজেই নির্দিষ্ট টোটেম আছে সেগুলো নানাবিধ কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত। উদাহরণস্বরূপ আমরা তুলসী গাছের কথা বলতে পারি। তুলসী গাছের সাথে হিন্দুদের নানা কর্মকাণ্ডের সম্পর্ক রয়েছে।
অন্যদিকে সর্বপ্রাণবাদ বলতে আত্মা, প্রেতাত্মার উপর বিশ্বাস স্থাপন করাকে বোঝায়। এখানে মনে করা হয় যে আত্মা প্রেতাত্মারা আমাদের সমাজে মানুষের মতোই ভিড় করে আছে। এদেরকে শুভ কিংবা অশুভ শক্তি হিসেবে দেখা হয়। এও মনে করা হয় যে এসমস্ত আত্মাগুলো মানুষের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে। ধর্ম ও যাদুবিদ্যা নিয়ে উপরে আলোচনার সময় আমরা স্যামনদের কথা বলেছিলাম। ঠিক এই জায়গাতেও স্যামনদের কথার উল্লেখ করা যেতে পারে।

বিশ্বের প্রভাবশালী তিনটি ধর্ম

পৃথিবীতে তিনটি সবচেয়ে প্রভাবশালী একেশ্বরবাদী ধর্ম হলো ইহুদী, খ্রীস্টান ও ইসলাম ধর্ম। মজার ব্যপার হচ্ছে এই তিনটি ধর্মের প্রতিটিরই জন্ম হয়েছে মধ্য-প্রাচ্যে এবং একটি আরেকটির দ্বারা প্রভাবিত।
ইহুদী ধর্ম ( Judaism)– আলোচিত এই তিনটি ধর্মের মধ্যে ইহুদী ধর্মই সবথেকে প্রাচীন ধর্ম হিসেবে পরিচিত। এর জন্ম হয়েছে খৃস্টপূর্ব এক হাজার অব্দে। প্রথমদিকের ইহুদী ধর্মালম্বীরা ছিলো যাযাবর, এবং প্রাচীনকালে এরা মিশর ও এর আশেপাশেই বসবাস করতো। ইহুদীদের ধর্মগুরুরা আংশিকভাবে ধারণা লাভ করেছিলো অঞ্চলে প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে। তবে পার্থক্য বলতে এতটুকুই যে ইহুদীরা এক সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের কাছে দায়বদ্ধ ছিলো। ইহুদীদের অধিকাংশ প্রতিবেশীই ছিলো একাধিক দেব-দেবতায় বিশ্বাসী।
খ্রিস্টান ধর্ম (Christianity)– ইহুদী ধর্মের অনেক মতামত গ্রহণ ও যুক্ত করেই খ্রিস্ট ধর্মের বিকাশ। যীশু একজন গোঁড়া ইহুদী ছিলেন এবং ইহুদি ধর্মের একটি গোষ্ঠী হিসেবে তিনি খ্রিস্টান ধর্মের সূচনা করেন। তবে এটা এখনও স্পষ্ট নয় যে, যীশুর একটি আলাদা ধর্ম প্রবর্তনের কোনো ইচ্ছা ছিলো কি না।
ইসলাম ধর্ম (Islam)- বর্তমান পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ ধর্ম ইসলাম ধর্মের জন্ম হয়েছে খ্রিস্টধর্ম জন্মের পাশাপাশি। খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকে মুহাম্মদ এর হাত ধরে এই ধর্মের শুরু।
এগুলো ছাড়াও আরও বেশ কিছু প্রভাবশালী ধর্মের প্রচলন রয়েছে। যেমন- হিন্দু ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম, কনফুসীয় ধর্ম, তাও (Tao) ধর্ম ইত্যাদি।

মানুষ কেন ঈশ্বরে বিশ্বাস করে?

একবিংশ শতাব্দীতে এসে আমরা দেখতে পাচ্ছি বিজ্ঞানের প্রভাবে ধর্মের গুরুত্ব দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। মার্ক্স এটাই চেয়েছিলেন। যদিও এখনও ধর্মের বলয় থেকে সমগ্র বিশ্ব বের হতে পারে নি। এ থেকে সহজেই অনুমেয় যে প্রতিটি সমাজে ধর্মের প্রভাব কতটা শক্তিশালী। কিন্তু মানুষ কেন এক অদেখা ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে? এটা মোটামুটি অজানা নয় যে প্রায় প্রতিটি ধর্মের উৎপত্তি হয়েছিলো বিভিন্ন সামাজিক অশান্তি বিশৃঙ্খলার সময়। সমাজে যখন নানা ধরনের অন্যায় অবিচার হয়েছে, তখনই কোন মহাপুরুষের হাত ধরে ধর্মের আবির্ভাব ঘটেছে। এখানে লক্ষ্যণীয় যে সমাজে স্থিতিশীলতা আনয়নের জন্য ধর্ম তখন বেশ ভালো ভূমিকা পালন করেছিলো। নিজের পাপের ফল যখন পরকালে ঈশ্বর নামক এক মহাক্ষমতাধরের কাছে দিতে হবে, এক অদেখা শক্তির উপর বিশ্বাস স্থাপন করে নিজেকে সঁপে দিতে হবে, আড়ালে কিংবা প্রকাশ্যে যা-ই করা হোক না কেন উপর থেকে তিনি সব দেখেন- এই ধরনের ভয়ভীতি যখন মানুষের মাঝে গেঁথে দেওয়া সম্ভব হয়েছিলো, তখন সমাজে কিছুটা হলেও স্থিতিশীলতা এসেছিলো। মানুষ এভাবেই ধর্মের সৃষ্টি করেছে। পৃথিবীতে মানুষের আগে ধর্ম আসেনি, মানুষ নিজেই ধর্মের সৃষ্টিকর্তা।

ধর্ম কি বিলুপ্তির পথে?

পশ্চিমা বিশ্ব অনেকাংশেই ধর্মের বিশাল প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পেরেছে, কিন্তু আমরা ঠিক ততটা দ্রুত সেটা করে উঠতে পারছি না। ভারতীয় উপমহাদেশে এখনো ধর্ম বেশ শক্তপোক্ত একটা আসনে অধিষ্ঠ হয়ে রয়েছে। তাহলে পশ্চিমা বিশ্ব কিভাবে এত দ্রুত পারলো? আমরা কেন পারছি না? এক্ষেত্রে রেনেসাঁর প্রভাব উল্লেখযোগ্য। যখন নানা ধরনের বিপ্লব চলছিলো, ঠিক তখনই ধর্মের বলয় থেকে পশ্চিমা বিশ্ব মুক্তির চেষ্টা করে। তাঁদের ক্ষেত্রে বিষয়টা যত সহজ ছিলো, আমাদের জন্য ততটা সহজ নয়। ধর্মীয় বিশ্বাস, ধর্মীয় প্রতীক, বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-আচরণ এখনো আমাদের কাছে বেশ পবিত্র বলে বিবেচিত হয়।
শেষ নয়, তবুও শেষ করছি। একটা অনলাইন পোস্ট খুব বেশি বড় করার পক্ষপাতী আমি না। ধর্ম থাকবে কি থাকবে না- সেটার থেকে বড় কথা সমাজে ধর্মের প্রভাব কতটা। সমাজবিজ্ঞানীদের একটা সীমাবদ্ধতা সবসময়ই থাকে, তাঁরা কখনো বিচার করতে পারেন না। তাঁরা নির্দিষ্ট করে বলে দিতে পারেন না, এটা ভালো ওটা খারাপ। ধর্ম নিয়ে অনেক হানাহানি কাটাকাটি আমাদের বাংলাদেশে হয়েছে। সেগুলো দুঃখজনক। সমাজে ধর্মের গুরুত্ব আছে, তবে ধর্মান্ধতা গুরুত্বহীন ও অপকারী। ধর্ম আর ধর্মান্ধতা একজিনিস নয়। মহাত্মা গান্ধীর একটা লাইন দিয়েই লেখাটা শেষ করছি। “God has no Religion”

 


 



 



বিস্তারিত পড়ুন

প্রধানমন্ত্রীর পদক ও আ.লীগ নেতাদের বাঘ হত্যা!

প্রধানমন্ত্রীর পদক ও আ.লীগ নেতাদের বাঘ হত্যা!
প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক 'চ্যাম্পিয়ন অব দ্যা আর্থ' পদক লাভ করেছেন। এজন্য দেশ-বিদেশে তার উদ্দেশে স্তুতির জোয়ার বইয়ে দিচ্ছে অনুরাগীরা। এর মধ্যেই সুন্দরবনের বাঘ হত্যায় আ.লীগের অবদান নিয়ে আলচনা চলছে। শেখ হাসিনা চ্যাম্পিয়ন অব দ্যা আর্থ হওয়ার দিন তিনেক বাদেই বিবিসি বাংলা পরিবেশমন্ত্রীর উদ্ধৃতি দিয়ে এ বিষয়ক একটি খবর প্রকাশ করেছে।
‘রাজনৈতিক মদত পাচ্ছে বাঘের চোরাশিকারিরা’ শিরোনামের প্রতিবেদনটিতে উঠে এসেছে, আ.লীগের স্থানীয় নেতাদের প্রশ্রয়ে কিভাবে বাঘ হত্যা হচ্ছে। প্রতিবেদনটির শুরুতেই বলা হয়েছে, ''বাংলাদেশের পরিবেশমন্ত্রী বলেছেন, সে দেশের সুন্দরবনে বাঘের চোরাশিকারিরা রাজনৈতিক প্রশ্রয় পাচ্ছে আর সে কারণেই বাঘ নিধনের ঘটনা এত বাড়ছে।'' হাসিনার এই আমলে রাজনৈতিক প্রশ্রয় লীগের নেতারা ছাড়া আর কে দিতে পারে? পরিবেশমন্ত্রীর এত বলার কথা না, যা বলেছেন তাই যথেষ্ট। বাংলাদেশের মতো একটি রাষ্ট্রে এতখানি বলতে পারাটা বেশ উৎসাহব্যঞ্জক।

সম্প্রতি ক্যামেরা-ট্র্যাপিং পদ্ধতিতে বাংলাদেশে যে বাঘ গণনার কাজ সম্পন্ন হয়েছে তাতে দেখা গেছে বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা এখন মাত্র ১০৬টি। অথচ মাত্র কিছুদিন আগেও জানা ছিল বাংলাদেশে প্রায় ৪০০ রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার আছে। সম্প্রতি চোরাশিকারীদের হাতে বেশ কিছু বাঘ হত্যার প্রমাণও মিলেছে। এর প্রেক্ষিতেই পরিবেশমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু চোরাশিকারীদের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের যোগসাজশের কথা উল্লেখ করেন। পরে তিনি বিবিসিকে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমি নিজে সুন্দরবন এলাকারই লোক। ওখানে সবাই জানে এই চোরাশিকারিরা কাদের প্রশ্রয় পায়। এদের কেউ স্পর্শ করতে পারে না পর্যন্ত!’
এমনকী বন বিভাগের প্রহরীরাও সব জেনেশুনেও ভয়ে এই চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে কিছু করতে পারে না– উল্টে বনরক্ষীদেরই তাদের কথা শুনতে হয় বলে জানান পরিবেশমন্ত্রী। তবে এই অবস্থা আজকের নয়– সুন্দরবনে বহুকাল ধরেই এ ঘটনা ঘটে আসছে বলে মি হোসেনের দাবি। তাঁর কথায়, ‘বাঘের চোরাশিকার ঠেকাতে র‍্যাব-পুলিশ-বিজিবি এমন কী নৌবাহিনী পর্যন্ত মোতায়েন করা হয়েছে; কিন্তু কাজের কাজ হয়নি কিছুই।’ সরকার ঢাকায় বসে যেই সিদ্ধান্তই নিক, সুন্দরবনের দুর্গম খালবিলের অন্দরে বা জঙ্গলের ভিতরে ‘সম্পূর্ণ অন্য ঘটনা ঘটে যায়’ বলেও স্বীকার করেছেন পরিবেশমন্ত্রী। যারা চোরাশিকারিদের মদত দেয়, তারা কেউ ‘সুন্দরবনের ধারেকাছেও থাকে না’ বলেও মন্তব্য করেছেন আনোয়ার হোসেন মঞ্জু।

শেখ হাসিনা কিভাবে চ্যাম্পিয়ন অব দ্যা আর্থ হলেন, এই প্রশ্ন জোরের সঙ্গেই তোলা উচিত, যখন দেখা যাচ্ছে, তার সরকার কেবল সুন্দরবন ধ্বংসের জন্য সেখানে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রই করছে না, এমনকি তার দলের লোকেরা সিন্ডিকেট করে ৩০০ বাঘ খেয়ে ফেলেছে! প্রশ্ন উঠবে, তাহলে জাতিসংঘ তাকে কিভাবে পরিবেশের রক্ষাকর্তার পদক দিল? উত্তরটা খুবই সোজা- জাতিসংঘ তথা পশ্চিমা শাসকদের জোট হাসিনার বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগকে আমলে নিতে চায় না। তারা চায় উন্নয়ন- পাহাড় কেটে, নদী ভরাট করে, বন ধ্বংস করে। এজন্যই শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যেন আর কোনো অভিযোগ হালে পানি না পায়, সেই আয়োজন করতে তাকেই বানিয়ে দেয়া হলো পরিবেশ রক্ষক। যেমনটা ওবামার ক্ষেত্রে হয়েছিল, তাকে নোবেল দেয়ার মাধ্যমে!
পাঠক এবার একটু গভীর মনোযোগ দিলেই বুঝতে পারবেন, সারা বিশ্বের পুঁজিপতিদের কাছে মুনাফা তৈরীটাই মূল উদ্দেশ্য। এজন্য তারা পৃথিবীটাকে উষ্ণ বানিয়ে ফেলেছে। এখনও তারা পরিবেশ ধ্বংস করে চলেছে। পরিবেশ ধ্বংসের আয়োজনে নেতৃত্ব দেয়ায় চ্যাম্পিয়নের পদকও বিলাচ্ছে। যারা পৃথিবীকে রক্ষা করতে চান, তাদেরকে একজোট হয়ে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হবে। মানুষ ঐক্যবদ্ধ হলে নিশ্চয়ই এই ছদ্মবেশী বাঘ খুনিদের সহজেই ঠেকিয়ে দেয়া যাবে।

বিস্তারিত পড়ুন